July 28, 2026
TRIPURA

বহু আগে থেকেই ত্রিপুরা রাজ্যে মোট ১৯টি স্বীকৃত তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায় বসবাস করে আসছে। বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি সম্প্রদায় নিজস্ব সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষা ও আচার-আচরণ নিয়ে এক একটি স্বতন্ত্র জাতি। আবার কোনো কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব লিপিও রয়েছে। জনজাতি সম্প্রদায়ের এই সকল মানুষজন তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী প্রথা ও রীতিনীতি দ্বারাই পরিচালিত হয়ে আসছে। সমাজে কোনো বিরোধ বা সমস্যা দেখা দিলে নিজেদের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে নেয়। যারফলে, জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষজন সচরাচর থানা বা সরকারি আদালতের খুব বেশী দ্বারস্থ হয় না। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিলের বিধান অনুযায়ী, ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসরত তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মান উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং তারা যাতে তাদের নিজস্ব প্রচলিত রীতি নিয়ে স্ব-শাসিত হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে নিয়ে ১৯৮৪ সালে ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্ব শাসিত জেলা পরিষদ বা Tripura Tribal Areas Autonomous District Council (TTAADC) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বশাসিত জেলা পরিষদ (ADC) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ত্রিপুরার জনজাতি সম্প্রদায়গুলোর প্রধান দাবি হলো কাস্টমারী ল’-এর বিধিবদ্ধ করা। কিন্তু বহু দশক অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও, জমাতিয়া সম্প্রদায়ের কাস্টমারী ল’ ছাড়া ত্রিপুরার অন্যান্য সম্প্রদায়ের কোন কাস্টমারী ল’ এখনো বিধিবদ্ধ করা হয়নি কিংবা কোনো আইন বা বিধিতে রূপান্তরিত করা হয়নি।

ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ (TTAADC) প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশক অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন জনজাতি সম্প্রদায়ের কাস্টমারী ল’ বা প্রথাগত আইন বিধিবদ্ধ না হওয়ার কারণে তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা আজ উদ্বিগ্ন ও গভীরভাবে ব্যথিত। কাস্টমারী ল’ বিধিবদ্ধ না হওয়ার ফলে ত্রিপুরার তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠান আজ বিলুপ্তির দ্বার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো বা বিলুপ্তি হতে পারে। অবশেষে গত ২৮/১২/২০২২ ইং তারিখে ত্রিপুরা, রিয়াং, ত্রিপুরি, চাকমা, গারো, উচোই, নোয়াতিয়া, মুরাসিং, কাইপেং, রুপিনি, হ্রাঙ্খল, মগ, মিজো এবং চোরোই সম্প্রদায়ের মোট ১৪টি কাস্টমারী ল’ বিল (Customary Law Bills) স্বশাসিত জেলা পরিষদ-র অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে পাস করা হয়। জানা মতে, মাননীয় রাজ্যপালের সম্মতি লাভের জন্য এই সকল কাস্টমারী ল’ বিলগুলো ত্রিপুরা সরকারের জনজাতি কল্যাণ দপ্তরে পাঠানো হয়। তবে, কিছু বিলের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা সংশোধনের জন্য সেগুলো আবার TTAADC-তে ফেরত পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট জনজাতি সম্প্রদায়গুলোর দ্বারা প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর, প্রথাগত আইন বিলগুলো অনেক আগেই TTAADC প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। আমরা জানতে পারি যে, ত্রিপুরি, চাকমা, গারো, উচোই, নোয়াতিয়া, কাইপেং, রুপিনি, হ্রাঙ্খল, মিজো এবং চোরোই সম্প্রদায়ের প্রথাগত আইন বিলগুলো এখনও TTAADC-প্রশাসনের নিকট পড়ে রয়েছে এবং মহামান্য রাজ্যপালের সম্মতির জন্য ত্রিপুরা সরকারের জনজাতি কল্যাণ দপ্তরে পাঠানো হয়নি।

জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রধান সমাজপতিদের পক্ষ থেকে বহুবার রাজ্য সরকার এবং TTAADC-প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও জনজাতি সম্প্রদায়ের কাস্টমারী ল’ গুলি বিদিবদ্ধ করার কোন পক্ষের তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। তাই অদ্য ২৭/০৭/২০২৬ তারিখে ট্রাইবেল কাস্টমারী ল’ কোঅর্ডিনেশন কমিটি মাধ্যমে সকল জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রধান সমাজপতিদের তরফ থেকে কাস্টমারী ল’ বিদিবদ্ধ করণের দাবী নিয়ে পুনরায় ত্রিপুরার  মুখ্যমন্ত্রী, প্রফেসর ডাক্তার মানিক সাহা সরকারি বাসভবনে এবং মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য, টি.টি.এ.ডি.সি. মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক এর কাছে পৃথক ভাবে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এদিন মুখ্যমন্ত্রী সরকারি আবাস থেকে ডেপুটেশন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে TRIPURA TRIBAL CUSTOMARY LAW COORDINATION কমিটির  কনভেনার শান্তি বিকাশ চাকমা বলেন আমরা আশাবাদী যে, রাজ্য সরকার এবং স্বশাসিত জেলা পরিষদ প্রশাসন জনজাতি সম্প্রদায়ের কাস্টমারী ল’ বা প্রথাগত আইনসমূহ বিধিবদ্ধ করার লক্ষ্যে দ্রুততার সহিত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন – যাতে কাস্টমারী ল’ বা প্রথাগত আইনসমূহ বিধিবদ্ধ করার দাবি নিয়ে ত্রিপুরার জনজাতি সম্প্রদায়ের জনগণকে রাজ্যব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হতে না হয়। আর কোন কারণে যদি জনজাতি সম্প্রদায় জনগণ রাজ্যব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন, তাহলে এর জন্য ত্রিপুরা সরকার এবং স্বশাসিত জেলা পরিষদ প্রশাসন দায়ী থাকবে, জনজাতি সম্প্রদায়ের জনগণ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *