অসমের ঐতিহ্যবাহী ভাওনা শিল্পের সঙ্গে প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্ত থেকেও এখনও সরকারি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত গোপাল বরকটাকী। শোণিতপুর জেলার জামুগুৰিহাটৰ ঐতিহাসিক কোচগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বরকটাকী ১৯৭৫ সাল থেকে ভাওনার মেকআপ ও পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। দীর্ঘ শিল্পীজীবনে তিনি ভাওনা, রাস এবং বিভিন্ন নাট্য প্রযোজনায় কাজ করে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুরাগী ও সাধারণ মানুষ তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অসম সরকারের কাছে শিল্পী পেনশন প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। গত পাঁচ দশকে বরকটাকী অসম, অরুণাচল প্রদেশ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এক হাজারেরও বেশি ভাওনা পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর শিল্পীসত্তার বিশেষ পরিচয় তৈরি হয়েছে ভাওনার অসুর ও দানব চরিত্রের জন্য তৈরি করা অভিনব মেকআপ নকশার মাধ্যমে। চরিত্রের স্বভাব, পৌরাণিক পরিচয় এবং মঞ্চ উপস্থাপনার প্রয়োজন অনুযায়ী মেকআপ ও পোশাককে তিনি আলাদা মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাজের পরিধি অসমের গণ্ডি পেরিয়ে অরুণাচল প্রদেশের সেপ্পা, বোমডিলা ও তাওয়াং পর্যন্ত পৌঁছেছে। এছাড়া রাজস্থানের জয়পুরেও তিনি ভাওনা ও সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে অসম সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ভাওনা কর্মশালাতেও তিনি রিসোর্স পার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও অসমের অন্যান্য জায়গা থেকে নিয়মিত তাঁকে ভাওনার মেকআপ ও পোশাক সংক্রান্ত কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁর দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা শিল্পী ও সাংস্কৃতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। ভাওনা অসমের বৈষ্ণব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এর মঞ্চসজ্জা, পোশাক ও চরিত্রভিত্তিক মেকআপ পরিবেশনার নান্দনিকতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই দিক থেকে বরকটাকীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এই ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক মহলের অনেকে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ভাওনা শিল্পে সক্রিয় থাকার পরও তাঁর সরকারি স্বীকৃতি বা শিল্পী পেনশন এখনও হয়নি। স্থানীয় মানুষের বক্তব্য, প্রবীণ শিল্পীদের অভিজ্ঞতা ও অবদান সংরক্ষণ এবং তাঁদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে সম্মানিত করার জন্য যথাযথ সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রায় পাঁচ দশকের নিরলস শিল্পসেবার পর গোপাল বরকটাকীর স্বীকৃতির দাবি তাই স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর মতো শিল্পীদের অবদান নথিবদ্ধ করা এবং তাঁদের কাজের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া অসমের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
