ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। এই চুক্তির প্রেক্ষাপট এবং শর্তাবলি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউস একটি বিস্তারিত তথ্যপত্র বা ফ্যাক্টশিট প্রকাশ করেছে। এই পদক্ষেপকে হোয়াইট হাউস একটি “ঐতিহাসিক” মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের সমীকরণকে আমূল বদলে দিতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের মতে, এই চুক্তির ফলে ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের এক বিশাল ও সম্ভাবনাময় বাজার মার্কিন পণ্যের জন্য উন্মুক্ত হবে, যা আমেরিকার রপ্তানি বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
এই চুক্তির প্রকৃত রূপরেখা এবং শর্তাবলি নিয়ে জনমনে যে অস্পষ্টতা ছিল, হোয়াইট হাউসের এই বিবৃতি তা দূর করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের পূর্বের একটি দাবিকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। তিনি দাবি করেছিলেন যে, ভারত মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপিত সমস্ত শুল্ক (Tariff) এবং অশুল্ক বাধা (Non-tariff barriers) পুরোপুরি প্রত্যাহার করে তা “শূন্য” বা জিরোতে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের বর্তমান স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, আমেরিকা ভারতের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজি হয়েছে। এই সমন্বয়ের মাধ্যমেই মূলত ট্রাম্পের সেই “শূন্য শুল্ক” দাবির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
চুক্তিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং কৌশলগত দিক হলো জ্বালানি রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি। রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরেই আমেরিকার জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। এই নতুন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত বড় সিদ্ধান্ত, কারণ এর ফলে ভারত তার দীর্ঘদিনের জ্বালানি উৎসের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। নয়াদিল্লির এই বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের আমদানির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ, ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং বাণিজ্যিক সুবিধা—উভয়কেই এই চুক্তিতে সুনিপুণভাবে সমন্বয় করা হয়েছে।
উপসংহারে বলা যায়, এই বাণিজ্য চুক্তিটি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক জটিলতা ও অমীমাংসিত সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। একদিকে যেমন মার্কিন কোম্পানিগুলো ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজারে সহজে প্রবেশাধিকার পাবে, অন্যদিকে ভারতও রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। এই চুক্তির ফলে কেবল বাণিজ্য নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সংহতি এবং সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি ও বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটি নিঃসন্দেহে একটি সুদূরপ্রসারী এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
