উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অসমের শিলচর এবং মিজোরামের সৈরাং-এর মধ্যে দেশের প্রথম সরাসরি যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবার শুভ সূচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ভার্চুয়ালি এই ঐতিহাসিক রেল সংযোগের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সরাসরি ট্রেনটি অসমের বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচর শহরকে মিজোরামের রাজধানী আইজলের নিকটবর্তী সৈরাং স্টেশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে এই সংযোগটি উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নতুন রেল পরিষেবার মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। এর আগে শিলচর ও মিজোরামের মধ্যে যাতায়াতের জন্য যাত্রীদের মূলত সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা পাহাড়ি অঞ্চলে সময়সাপেক্ষ এবং প্রায়শই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সরাসরি ট্রেন পরিষেবা চালু হওয়ার ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময়ের সাশ্রয় হবে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী, চিকিৎসার জন্য আসা রোগী এবং পর্যটকদের জন্য এই ট্রেনটি আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।
কেবল যাতায়াত নয়, এই সরাসরি রেল সংযোগ দুই রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এটি এক নতুন গতির সঞ্চার করবে। মিজোরামের বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এখন আরও দ্রুত এবং কম খরচে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একইভাবে মিজোরামের স্থানীয় কৃষিজাত পণ্য ও হস্তশিল্পের সামগ্রী খুব সহজেই অসমের বাজারে এবং পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া যাবে। এই অর্থনৈতিক আদান-প্রদান সামগ্রিকভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এই রেল প্রকল্পটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি এবং কঠিন ভূখণ্ডে রেললাইন স্থাপন করা এবং সৈরাং পর্যন্ত পৌঁছানো ভারতীয় রেলের এক অসাধারণ কৃতিত্ব। এই সংযোগটি শুধুমাত্র দুটি শহরকে নয়, বরং অসম ও মিজোরামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বন্ধনকেও আরও সুদৃঢ় করবে। রেলমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির অধীনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এই প্রকল্পটি তারই একটি সফল প্রতিফলন।
পরিশেষে বলা যায়, শিলচর-সৈরাং সরাসরি ট্রেন পরিষেবা উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন। এই সংযোগটি কেবল দূরত্ব কমায়নি, বরং এটি আঞ্চলিক সংহতি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ প্রশস্ত করেছে। আগামী দিনে এই রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হলে এবং পরিকাঠামো আরও উন্নত করা হলে এটি সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে ভারতের সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, এই নতুন রেল সংযোগটি উত্তর-পূর্বের মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল ও প্রগতিশীল ভবিষ্যতের সূচনা করল।
