ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল বা ডিএসি-র বৈঠকে ভারতীয় বায়ুসেনা ও নৌবাহিনীর জন্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকার অস্ত্র সংগ্রহের প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় বায়ুসেনা ১১৪টি অত্যাধুনিক রাফাল মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান পেতে চলেছে এবং নৌবাহিনীর সামুদ্রিক নজরদারি ক্ষমতা বাড়াতে যুক্ত হতে চলেছে আরও ৬টি পি-এইট-আই (P-8I) পোসেইডন বিমান। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রভাবশালী প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে, যা মূলত দুই প্রতিবেশী দেশের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতীয় বাহিনীকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে।
প্রস্তাবিত এই বিশাল চুক্তির আওতায় ১১৪টি রাফাল বিমানের মধ্যে প্রথম ১৮টি ফ্রান্স থেকে সরাসরি ‘ফ্লাই-অ্যাওয়ে’ বা ওড়ার উপযোগী অবস্থায় ভারতে আসবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবশিষ্ট ৯৬টি যুদ্ধবিমান ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশীয় প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারতেই নির্মিত হবে। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থা এক নতুন গতির সঞ্চার করবে। বায়ুসেনার জন্য এই যুদ্ধবিমানগুলো অত্যন্ত জরুরি ছিল, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন সংখ্যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল। রাফালের মতো ‘৪.৫ জেনারেশন’ প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিতে আকাশপথে ভারতের প্রতিরক্ষা প্রাচীর আরও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে নৌবাহিনীর জন্য ৬টি পি-এইট-আই নজরদারি বিমানের অনুমোদন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে চীনের নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা এবং সমুদ্রপথে শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজের গতিবিধি শনাক্ত করার জন্য এই অত্যন্ত উন্নত দূরপাল্লার নজরদারি বিমানের কোনো বিকল্প নেই। এই বিমানগুলো অত্যাধুনিক রাডার এবং ইলেকট্রনিক সেন্সর সমৃদ্ধ, যা কেবল নজরদারি নয় বরং প্রয়োজনে শত্রুপক্ষের সাবমেরিন ধ্বংসেও সমান কার্যকর। এই দ্বিস্তরীয় শক্তিবৃদ্ধির ফলে ভারত একদিকে যেমন উত্তর ও পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত করতে সক্ষম হবে, অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমানাতেও নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বজায় রাখতে পারবে।
প্রায় ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকার এই বিশাল ব্যয়ের অনুমোদন কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের স্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এই পরিষদ দেশীয় উৎপাদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা আগামী দিনে ভারতকে অস্ত্র আমদানিকারক দেশ থেকে অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশে রূপান্তর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সামগ্রিকভাবে, এই মেগা প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর মধ্যে এক আধুনিক ও প্রযুক্তিগত ভারসাম্য তৈরি করবে।
