২০২৬ সালের জাপানের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নিরঙ্কুশ জয় বাজারের অস্থিরতা কাটিয়ে তাকে একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনের আগে তার বিশাল ব্যয়ের পরিকল্পনাগুলো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে উদ্বেগ ছিল, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। সোমবার জাপানের শেয়ার বাজার ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে, কারণ ভোটাররা তাকাইচির দলকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অন্যতম বৃহত্তম জয় এনে দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা যেমনটা আশঙ্কা করেছিলেন, ইয়েন এবং সরকারি বন্ডের বাজারে তেমন কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি; বরং বিগত কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার তুলনায় বাজার এখন অনেক বেশি শান্ত।
বিনিয়োগকারীদের এই ইতিবাচক সাড়া ইঙ্গিত দেয় যে, তারা প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি এবং তার দল এলডিপি-র ওপর আস্থা রাখতে ইচ্ছুক। তারা ধারণা করছেন, তাকাইচির এই ‘সুপার মেজরিটি’ বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা দূর করবে এবং আর্থিক ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেবে। এইচএসবিসি-র প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যান মনে করেন, এই জয় শেয়ার বাজারের জন্য অনুকূল হাওয়া হিসেবে কাজ করবে। তার মতে, একটি শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং করপোরেট মুনাফা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবে। এছাড়া বাজারে এই বিশ্বাসও তৈরি হয়েছে যে, শক্তিশালী সরকার হওয়ার ফলে তারা এলোপাথাড়ি খরচ না করে বরং সুশৃঙ্খলভাবে ব্যয় করবে, যা বন্ড মার্কেটে বড় কোনো ধস নামার ঝুঁকি কমিয়ে দেবে। যদিও সোমবার শুরুতে বন্ডের সুদের হার কিছুটা বেড়েছিল, তবে দ্রুতই তা স্থিতিশীল হয়ে আসে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশাল জয়ের পর জাপানি ইয়েনের মান শক্তিশালী হয়ে প্রতি ডলারে ১৫৬.২২-এ পৌঁছেছে, যা বাজার বিশ্লেষকদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। নীতিনির্ধারকদের সময়োপযোগী আশ্বাস বাজারের এই ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা স্পষ্ট করেছেন যে, প্রস্তাবিত খাদ্যপণ্যের ওপর কর ছাড় কেবল দুই বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং এর জন্য বাড়তি কোনো ঋণ নেওয়া হবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিশাল জয় তাকাইচিকে লাগামহীন খরচের সুযোগ দিচ্ছে না; বরং দল হিসেবে এলডিপি ঐতিহাসিকভাবেই মিতব্যয়ী এবং তাকাইচি বন্ড বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিষয়ে বেশ সচেতন। এছাড়া নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর শোচনীয় পরাজয়ের ফলে স্থায়ীভাবে কর ছাড়ের ঝুঁকিও এখন দূর হয়েছে, যা বন্ড মার্কেট এবং ইয়েনের জন্য সহায়ক হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের এই আস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে শেয়ার বাজারেও। জেপিমরগান চেজ-এর মতো বড় সংস্থাগুলো জাপানি শেয়ার সূচক ‘নিক্কেই ২২৫’-এর লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬১,০০০ নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারগুলো তাকাইচির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শিনজো আবের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে জাপানের রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা ছিল, এই জয় তা দূর করেছে। তবে বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি সরকারের খরচ পরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যতে অপরিকল্পিত মনে হয় বা মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়, তবে বাজারে আবারও অস্থিরতা ফিরতে পারে। আগামী মার্চে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাকাইচির বৈঠক এবং ফেব্রুয়ারির বাজেট অধিবেশনের ওপর এখন সবার নজর থাকবে। আপাতত, আগেভাগে নির্বাচন ডাকার তাকাইচির ঝুঁকিটি সফল হয়েছে এবং জাপানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।
