মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত জলরাশিতে আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কালো ছায়া নেমে এসেছে। সম্প্রতি ওমান উপসাগরে মার্কিন মালিকানাধীন একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের চালিত অত্যাধুনিক আন্ডারওয়াটার বা ডুবো ড্রোন হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। এই নজিরবিহীন হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্ফোরক বোঝাই একটি ড্রোন জলের নিচ দিয়ে এসে সজোরে জাহাজটির গায়ে আঘাত হানে। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, জাহাজের একটি অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডিউটিরত অবস্থায় থাকা ওই ভারতীয় ক্রু সদস্য ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ভারত সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করা হয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ব্যবহৃত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ এবং হামলার ধরণ স্পষ্টভাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (IRGC) প্রযুক্তির দিকে আঙুল তুলছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে ওই অঞ্চলে গত কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা উত্তেজনা এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে এই ধরনের আধুনিক ডুবো ড্রোনের ব্যবহার নৌ-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা কেবল একটি জাহাজের ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুটগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরির একটি অপচেষ্টা। ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই ধরনের হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজ বিমার খরচও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত যেহেতু তার জ্বালানি আমদানির জন্য এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু দিল্লির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনী ইতিমধ্যে ওই এলাকায় টহলদারি বাড়িয়েছে এবং ভারতীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছে।
বর্তমানে জাহাজটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো এই ঘটনার জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে, তেহরান যদি এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে গোটা অঞ্চল এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দিকে, যাতে সমুদ্রপথে নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি বন্ধ হয় এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিস্থাপন সম্ভব হয়।
