February 12, 2026
pst 4

শিক্ষকের গায়ে হাতে তাই তৃণমূলের অন্দরেও বেসুর। নেতৃত্ব রাম-বামের প্ররোচনার সাফাই দিচ্ছে। যাদবপুরে ওমপ্রকাশ মিশ্রকে লাথির খবর হয়নি বলে মিডিয়াকে গালাগাল দিচ্ছে। ভিডিও প্রকাশ করে তাদের ওপর আগে হামলার যুক্তি দিচ্ছে পুলিশ। তাতে ভোলানো যাচ্ছে না তৃণমূলের অনেককে। দলের সদস্য শিক্ষকরা তো ননই। কেউ প্রকাশ্যে বলছেন। কেউ ভেতরে ভেতরে গুমরোচ্ছেন।

আরজি কর মেডিকেলে চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনেও এতটা অসন্তোষ তৃণমূলে ছড়ায়নি। শান্তনু সেন, সুখেন্দুশেখর রায়ের মতো দু’একজন প্রতিবাদ করেছিলেন। এর বেশি নয়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজত্বে এই প্রথম তাঁর দলের অন্দর থেকে এতটা প্রতিবাদ ঠিকরে বেরোচ্ছে। তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সংগঠনের আলিপুরদুয়ার জেলা সম্পাদক ভাস্কর মজুমদার ‘পুলিশের এই নির্লজ্জ ব্যবহার’-এর জন্য সংবাদমাধ্যমে শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

তাঁর দল পেছনে বিরোধীদের চক্রান্ত দেখছে। ভাস্কর কিন্তু পুলিশকে অনুরোধ করছেন, ‘অন্য রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে এই ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলবেন না।’ একই জেলায় তৃণমূল শিক্ষা সেলের সর্বোচ্চ নেত্রী শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তীর রাগ, ক্ষোভ, হতাশা প্রকাশ হয়ে গিয়েছে সমাজমাধ্যমের পোস্টে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে তাঁর কাছে অন্যায়ের বিচার চেয়েও শর্মিষ্ঠা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘ওঁরা ক্রিমিনাল না। ওঁরা শিক্ষক… যাঁদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। ওঁরা বোমাবাজি করেন না।’

স্পষ্ট উচ্চারণে তৃণমূলের এই শিক্ষক নেত্রী লিখেছেন, ‘পুলিশের… এই লাথি এবং লাঠি আমাকেও আহত করল।’ লক্ষণীয়, লাঠির চেয়েও জোর পড়ছে লাথিতে। শিক্ষককে পদাঘাত! তৃণমূল নেতৃত্ব বা পুলিশ যতই ব্যাখ্যা দিক, এই পদাঘাতের ছবিটা ঝড় তুলেছে শাসকদলের মধ্যেও। ভাস্কর বা শর্মিষ্ঠার মতো সবাই হয়তো প্রকাশ্যে সোচ্চার নন। তবে কোচবিহার থেকে কলকাতা, তৃণমূল সমর্থক অনেকেই একান্ত আলাপে হতাশা, ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্রকে পদাঘাত সমান নিন্দনীয়। ওমপ্রকাশের গায়ে ছাত্রের লাথির ওই ছবিটা বাংলার কলঙ্ক। গোটা শিক্ষককুলের অপমান। একইরকম শিউড়ে উঠতে হয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান শাসক সমর্থক পড়ুয়াদের অপছন্দের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষকদের লাথি মারার ভাইরাল ভিডিও দেখে। পুলিশের লাথি পড়েছে শিক্ষকের পেটে। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই পেটে লাথি। চাকরি চলে যাওয়া মানে তো পেটে লাথি পড়াই। অথচ মেধার ভিত্তিতে নিযুক্ত এই শিক্ষকদের কোনও অপরাধ নেই। অপরাধ স্কুল সার্ভিস কমিশনের। যারা যোগ্য ও অযোগ্য শিক্ষকের ফারাক করতে পারেনি। পারেনি না ইচ্ছা করে করেনি, সন্দেহ থাকে। ওএমআর শিট পুড়িয়ে ফেলার গল্পটার বিশ্বাসযোগ্যতাও এখন প্রশ্নের মুখে। তড়িঘড়ি মিরর ইমেজ নষ্ট করার মধ্যে চক্রান্ত স্পষ্ট। অপরাধ করল স্কুল সার্ভিস কমিশন, আর চাকরিহারা হলেন যোগ্য শিক্ষকরা।

বিবেক বলে তো একটা বস্তু আছে। তৃণমূলেও তাই এত ঝড়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহের পাত্রী বলে পরিচিত সাংসদ সায়নী ঘোষও পুলিশের প্ররোচনার যুক্তিতে সায় দিচ্ছেন না। তাঁকে বলতে হচ্ছে, ‘পরিস্থিতি যেমনই হোক… যাঁদের রুজি-রুটি চলে গিয়েছে, যাঁরা যোগ্য, তাঁদের প্রতি মানবিক হওয়া উচিত।’ শিক্ষকদের গায়ে লাঠি, লাথি মেরে আসলে মনুষ্যত্বের অপমান করেছে পুলিশ। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার কৃষ্ণমৃত্তিকা নাথের সেই হাহাকারের ভিডিওটা কি আমাকে-আপনাকে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দিচ্ছে? কৃষ্ণমৃত্তিকার প্রশ্ন ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনি তুলছে, এরপর কী করবেন এই শিক্ষকরা! জীবিকা গেল, সম্মান গেল। পরিবার নিয়ে অথই জলে পড়লেন যাঁরা, তাঁরা কোন ভরসায় নিশ্চিন্তে বসে থাকবেন? আন্দোলন, প্রতিবাদ, রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করা ছাড়া আর কী উপায় আছে তাঁদের সামনে?

অথচ শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু প্রশ্ন তুলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী যেখানে নিজে আশ্বস্ত করছেন, সেখানে আন্দোলন করার দরকার কী! ঠান্ডা মাথায় ভাবুন ব্রাত্যবাবু, যাঁদের কাল থেকে বাড়িতে দু’মুঠো জোগাড়ের চিন্তায় পাগলপারা দশা, তাঁদের আশ্বস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি আছে কি? নিয়োগ বাতিল করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই চাকরি ফেরানোর ক্ষমতা কোনও আইনই রাজ্য সরকারকে দেয়নি। ব্রাত্য বলছেন, রাজ্য সরকার কোনও শিক্ষককে ছাঁটাই করেনি। তো?

শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে তাঁদের চাকরিতে রেখে দিতে পারবে রাজ্য সরকার? যোগ্য, অযোগ্যদের আলাদা করতে না পারলে রিভিউ পিটিশন করলেই সুপ্রিম কোর্ট রায় সংশোধন করবে? চাকরিহারা শিক্ষকদের স্কুলে ফিরতে বলেছেন মমতা। এতে আদালত অবমাননায় তিনি অভিযুক্ত হলে আইনে চাকরিচ্যুতদের নিয়েও টানাটানি পড়ে যেতে পারে। রায় অগ্রাহ্য করলে তাঁরাও আদালত অবমাননায় অভিযুক্ত হতে পারেন।

স্কুলে যেতে বলছেন মুখ্যমন্ত্রী, কিন্তু বেতন? সরকারি বেতনের পোর্টালে এখনও নাম থাকলেও পরের মাসে মাইনে জোটা নিয়ে সংশয় কাটেনি। সন্দেহের কারণ, চাকরিহারাদের স্বেচ্ছাশ্রম (ভলান্টারি সার্ভিস) দিতে বলা। যাঁরা এতদিন ভদ্রস্থ অঙ্কের মাইনে পেয়েছেন, তাঁদের হঠাৎ নিজের ও পরিবারের পেটে গামছা বেঁধে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে বলা তো কার্যত শিক্ষকদের উপহাস করা। চাকরি গিয়েছে, এখন উপহাস সইতে হবে? তাছাড়া আপাতত স্বেচ্ছাশ্রম দিলে ভবিষ্যতে চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছেন কি মুখ্যমন্ত্রী? তাহলে সেই ঘোষণাটা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার করে দিক। যদিও সেই ঘোষণা আবার আইনের জালে আটকে পড়বে না, এমন নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। ফলে শুধু দিদি আছেন, চিন্তা নেই বললেই কি নিশ্চিন্ত হতে পারেন চাকরিহারারা? জল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে, চাকরিহারাদের পার্শ্বশিক্ষক বানিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। নাকের বদলে নরুন দেওয়াটাও কিন্তু অপমানই! মেধার তো বটেই, মনুষ্যত্বের অপমান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *