টেলিকম জায়ান্ট ভারতী এয়ারটেল এখন শুধু মোবাইল নেটওয়ার্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। রিলায়েন্স জিওর আর্থিক খাতের অগ্রযাত্রাকে টেক্কা দিতে এয়ারটেল এবার ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে তাদের নন-बैঙ্কিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি (NBFC) লাইসেন্সের মাধ্যমে। এই বিশাল অংকের বাজি বা ‘গ্যাম্বিট’ নিয়ে বর্তমানে ভারতের কর্পোরেট মহলে ব্যাপক চর্চা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, এয়ারটেলের এই পদক্ষেপ কি জিও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মতো একটি মাস্টারস্ট্রোক হতে চলেছে, নাকি এটি তাদের মূল টেলিকম ব্যবসা থেকে মনোযোগ সরিয়ে একটি ব্যয়বহুল বিচ্যুতিতে পরিণত হবে? এয়ারটেল পেমেন্টস ব্যাংকের অভাবনীয় সাফল্যের পর কোম্পানিটি এখন বড় অংকের ঋণ বা লোন প্রদানের ব্যবসায় নামতে চাইছে, যা তাদের গ্রাহক প্রতি গড় আয় (ARPU) বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
এয়ারটেলের এই নতুন পরিকল্পনার মূলে রয়েছে তাদের বিশাল ডাটাবেস। কোটি কোটি গ্রাহকের রিচার্জ করার ধরন, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোম্পানিটি সহজেই বুঝতে পারবে কাকে কত টাকা ঋণ দেওয়া নিরাপদ। ২০ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ মূলত ক্ষুদ্র ঋণ (Micro-loans), ব্যক্তিগত ঋণ এবং ডিজিটাল ক্রেডিট কার্ডের মতো পরিষেবাগুলোতে ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এয়ারটেল যদি তাদের বিদ্যমান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সঠিক আর্থিক পণ্য সরবরাহ করতে পারে, তবে এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান ফিনটেক বাজারে একটি বড় পরিবর্তন আনবে। তবে এই পথে ঝুঁকিও কম নয়; কারণ আর্থিক বাজারে পা রাখা মানেই উচ্চ খেলাপি ঋণের (NPA) ভয় এবং কঠোর রেগুলেটরি নিয়মের মধ্যে থাকা, যা অনেক সময় টেলিকম কোম্পানির মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। ভারত বর্তমানে একটি ডিজিটাল ইকোনমির দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং টেলিকম গ্রাহকদের আর্থিক পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা এখন বিশ্বব্যাপী একটি সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। রিলায়েন্স জিও যেভাবে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে আলাদা সত্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, এয়ারটেল ঠিক সেই পথেই হাঁটতে চাইছে। তবে ২০ হাজার কোটি টাকা একটি বিশাল অংক, যা টেলিকম নেটওয়ার্ক আপগ্রেড বা ৫জি (5G) বিস্তারে ব্যবহার করা যেত। তাই বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ চিন্তিত যে, টেলিকম যুদ্ধের মাঝখানে ফিন্যান্স ব্যবসায় এত বড় ফোকাস কোম্পানির ব্যালেন্স শিটে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না।
পরিশেষে, এয়ারটেলের এই ফিন্যান্স ব্যবসা সফল হবে না কি লোকসান বয়ে আনবে, তা নির্ভর করবে তাদের ম্যানেজমেন্টের দূরদর্শিতার ওপর। যদি তারা টেলিকম এবং ফিন্যান্সের মধ্যে একটি নিখুঁত মেলবন্ধন বা ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরি করতে পারে, তবে এটি হবে তাদের ব্যবসার টার্নিং পয়েন্ট। আর যদি তারা ঋণ আদায় বা বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, তবে এই ২০ হাজার কোটি টাকা কেবল একটি ‘কস্টলি ডিস্ট্রাকশন’ বা ব্যয়বহুল ভুল হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে। তবে ভারতের বাজার পরিস্থিতি বলছে, ফিনটেক খাতে এখনো অনেক সম্ভাবনা বাকি আছে এবং এয়ারটেলের মতো শক্তিশালী ব্র্যান্ডের জন্য এই বাজিটি নেওয়া হয়তো অনেকটা অনিবার্যই ছিল
